Breaking News

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য প্রাণহীন গণতান্ত্রিক কাঠামো

বাংলাদেশের জনগণের কাছে গণতন্ত্রের আবেদন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গণতন্ত্রের প্রতি তাদের দু'র্বলতা প্রবল। যুগে যুগে তাই জনগণ গণতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আদর্শ ব্যবস্থা বলে সবসময় চিহ্নিত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৈনিকরূপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ত্যাগ স্বীকারও করেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশীদার হয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রণোদনা লাভ করে পাকিস্তানের বলদর্পী শাসনকারী এলিট গোষ্ঠী যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পথ রুদ্ধ করে, তখন এই ভূখণ্ডের মানুষ ফুঁসে ওঠে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এভাবে, যখন পেশিশক্তির মাধ্যমে জনগণের রায়কে বিধ্বস্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র রয়ে গেছে তাদের আকাঙ্ক্ষায়, তাদের প্রত্যাশায়। শুধু বিদ্যমান রয়েছে তাদের দু’চোখ ভরা স্বপ্নে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের কাছে এখনও সেই মোহনীয় সোনার হরিণ। আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু তাদের জীবনকে অনেক ক্ষেত্রেই স্পর্শ করেনি।

পাশ্চাত্যের উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় গণতন্ত্র সফল হয়েছে প্রধানত দুটি কারণে- এক. যে সামাজিক উপত্যকায় গণতন্ত্রের সুর ঝঙ্কৃত, তা মোটামুটিভাবে মসৃণ এবং সমতল। বৈষম্য, তা সস্পদসৃষ্ট হোক আর জাতিগত বা ধর্মের ভিন্নতাজনিত হোক, ওই সব সমাজে অনতিক্রম্য নয়। নয় অজেয়। আজ যিনি নির্ধন, আগামীকাল সমাজ প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ফলে তিনিও শীর্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। জাতি-ধর্ম বা নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা তার অগ্রগতির অভিযাত্রা রুদ্ধ করতে সক্ষম নয়। তাই সমতল সমাজভূমিতে নাগরিকদের জীবন হয়ে উঠেছে শ্যামল, সমৃদ্ধ, সুষমামণ্ডিত; দুই. অর্থনৈতিক সুখ-সুবিধাও ওই সব সমাজে এমনভাবে বিস্তৃত যে, প্রত্যেকেই জীবনের সর্বনিম্ন চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। যার কোনো কর্মসংস্থান নেই, তিনিও দারিদ্র্যের অভিশাপে অভিশপ্ত নন। এসব ক্ষেত্রে সমাজই এগিয়ে আসে ওই সব দুস্থ ও দরিদ্রের সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটানোর জন্য, সহায়তার ডালা সাজিয়ে। দেশের আইন এমনভাবে বিন্যস্ত যে, শুধু আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেই সবাই মানবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম। এসব সমাজে কাউকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হতে হয় না। সুতরাং উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর চুলচেরা বিশ্নেষণে প্রবৃত্ত হোন, দেখবেন গণতন্ত্রকে সফলভাবে বাস্তবায়নের সব শর্তই প্রায় সামাজিক; রাজনৈতিক নয়। নয় রাজনৈতিক কাঠামো বা রাজনৈতিক কার্যক্রম সংক্রান্ত।

কার্যত পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল সামাজিক এক ব্যবস্থারূপে। সমাজেই তার দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সার্থক প্রয়োগ ঘটে। আগে সমাজ গণতান্ত্রিক হয়েছে। দেখাদেখি পরে রাষ্ট্র হয়েছে গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশে, এমনকি বিশ্বের এই অংশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে; বৈষম্যক্লিষ্ট হাজারো প্রকরণে বিভক্ত, জাতি-ধর্মের ভিন্নতাপীড়িত সমাজে। এসব জনপদে সামাজিক মূল্যবোধ এখনও গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহিষুষ্ণতার অমৃতরসে সিক্ত। সহনশীলতার পাঠ সমাজ জীবনে এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই এসব সামাজিক মূল্যবোধহীন জনপদে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতি পদে হোঁচট খাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষণ টিকে রয়েছে টলটলায়মান অবস্থায়, হাজারো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নির্দেশনা হলো- সৃজনশীল রাজনৈতিক নেতাদের গতিশীল নেতৃত্বের আলোকে গণতন্ত্রের সঠিক বিকাশের জন্য সমাজে গণতন্ত্রের জন্য উর্বর ক্ষেত্র রচনা করা। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, রাজনৈতিক নেতারা এখনও তেমন সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময়ও পাননি। এসব বিষয়ে খেয়ালও করেননি। এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের এমন মহামূল্যবান মণি-মুক্তা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কখনও ভেবে দেখেননি, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুরো সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ ভুলটি প্রায় সবাই কমবেশি করেছেন এবং করছেন। যারা ক্ষমতা দখলে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তারাও এ বিষয়ে সজ্ঞাত নন।

বাংলাদেশের জন্মক্ষণ থেকেই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কোনো পর্যায়ে এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে বলে মনে হয় না। পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনগণের সচেতনতা যতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক নেতাদের গণতন্ত্রকে সফল করা, তথা সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিকতাকে বাস্তবায়িত করার দৃঢ় সংকল্প এবং সৃজনশীল মন-মানসিকতার। বাংলাদেশে প্রথমটি বিদ্যমান থাকলেও দ্বিতীয়টির বড় আকাল দেখা যায় সবসময়। এই অভাবটা পূরণ করতে হবে আমাদের রাজনীতিকদের। আমার বিশ্বাস, তারা তা পারবেন। তাদের শুধু একটু আকাশমুখী হতে হবে। মাত্র দুই হাজার ফুট উঁচুতে উঠে এই মাটিকে যেমন সুদৃশ্য ছবির মতো সুন্দর মনে হয়, তেমনি আদর্শিক অঙ্গীকারের খানিকটা ধারণ করে অগ্রসর হলে যে সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে জটিল বলে মনে হয়, তাও নিয়ন্ত্রণে আসবে। পারবেন কি আমাদের রাজনীতিকরা এ দেশের গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে? জনগণ কিন্তু চেয়ে রয়েছে তাদেরই দিকে। বাংলাদেশে রাজনীতি কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমীকরণও রয়েছে নানারকমভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে।

যেমন, ক্ষমতাসীনদের পক্ষপাতিত্বের নীতির মূলে রয়েছে পোষক-আশ্রিত সম্পর্কের অশুভ প্রভাব। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং তাও কোনো মহলের বিনা প্রতিবাদে, তারও মূল নিহিত রয়েছে এই সম্পর্কের অভ্যন্তরে। আইনের প্রাধান্যের পরিবর্তে ব্যক্তির আধিপত্যের মূলেও রয়েছে এটি। এ পরিপ্রেক্ষিতে জবাবদিহি অর্থহীন। অর্থহীন নীতিমালা ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতাও। পাশ্চাত্যেও পোষক-আশ্রিত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল দীর্ঘদিন। প্রায় হাজার বছরের মতো। ভূমির সঙ্গে ভূমিতে বসবাসকারীরাও ছিল সামন্ত প্রভুর দখলে। সেই সমাজব্যবস্থায় ছিল না সাম্যের চেতনা। ছিল না স্বাধীনতা-স্বাতন্ত্র্যের কোনো অনুরণন। ছিল না সৌভ্রাতৃত্বের বিন্দুমাত্র। ছিল শুধু পোষকের আধিপত্য আর আশ্রিতদের হীনম্মন্যতা ভরা অধীনতা। সমাজে ছিল কিছু নির্দেশদাতা, আর নীরবে সেই নির্দেশ পালন করার মানুষজন। সেই কর্কশ বালুরাশিতে গণতন্ত্রের চিহ্নমাত্র ছিল না। সেই পাশ্চাত্য আজ গণতন্ত্রের সোনালি ফসলের পরিপূর্ণ গোলা। এটি সম্ভব হয়েছে দীর্ঘকালীন পরিসরে সামাজিক জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে। শিল্প বিপ্লবের ফলে নতুন নতুন শ্রেণির সৃষ্টি হয়, যারা শুধু শাসনব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার দাবিতে অটল রইল না, সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক দক্ষতার ডালাও সাজিয়ে আনল। আবেগের পরিবর্তে যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে, ভূখণ্ডের সঙ্গে একাত্মতা প্রতিষ্ঠা করে, এক ধরনের জাতীয়তাবাদে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, জনতার সংঘবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে জাতি-রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে নতুন যুগে। এই প্রেক্ষাপটেই গণতন্ত্রের বিকাশ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে ইউরোপ তথা পাশ্চাত্যে।

বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন। হাজারো বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়ে পাশ্চাত্য যেভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে একটার পর একটা ধাপ অতিক্রম করে আধুনিকতার আলোকে সমুজ্জ্বল হয়েছে, বাংলাদেশের তেমন সুযোগ হয়নি। রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জনগণের অধিকারের পূর্ণতার জন্য সবচেয়ে সহজ ও সরল পথ হলো বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে, গণতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপক বিস্তৃতি। যদি জনগণ একবার বিশ্বাস করে যে, তাদের সম্মতি ছাড়া তাদের শাসন করার কারও অধিকার নেই, তাদের সম্মতি ছাড়া তাদের ওপর কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই, তাদের ভোটাধিকার নিয়ে নয়ছয়ের অবকাশের পথ রুদ্ধ, তাদের ভোট তারাই দেবে, যাকে খুশি তাকে দেবে, তাহলেই গণতন্ত্রের প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়। জনগণের মনে যদি এই বিশ্বাস একবার দৃঢ় হয়, সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস তারাই এবং এই ক্ষমতা তাদের কল্যাণেই শুধু ব্যবহূত হবে, অন্য কারও জন্য নয়, তাহলেই গণতন্ত্রের ক্ষেত্র উর্বর হয়ে উঠবে। কিন্তু এককভাবে কোনো ব্যক্তির পক্ষে আধুনিক গণতন্ত্রে কোনো ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। সামাজিক সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই তা সম্ভব। অন্য কথায়, রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামো, কার্যক্রম ও প্রক্রিয়া-পরিবেশ সর্বাগ্রে গণতান্ত্রিক হওয়ার একান্ত প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি একদিনে সৃষ্টি হয় না। হয় না এক যুগেও। দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টায় তা সম্ভব হয়। সম্ভব হয় সচেতনভাবে সংগঠিত সৃজনশীল এক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে। তা ছাড়া আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, আপসকামিতা ও জবাবদিহির দলগুলোর বিকাশ অবশ্য প্রয়োজনীয়। সামন্ত যুগের মন দিয়ে গণতান্ত্রিক যুগের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কাঠামো তৈরি হয়েছে বটে; কিন্তু সেই কাঠামোয় প্রাণের সঞ্চার এখনও হয়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্তৃত্ববাদী মনের উত্তাপে গণতন্ত্রের কাঠামোগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে শুস্ক, বিবর্ণ কাষ্ঠখণ্ডের মতো। এ দেশের মানুষ তো এর জন্য ত্যাগ স্বীকার করেনি। মানুষের ত্যাগ-অনুভূতি-চাওয়ার বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে। রাজনীতির অস্বচ্ছতা দূর করে জনকল্যাণমুখী রাজনীতির পথ মসৃণ করতে হবে।

Check Also

পুকুর সেঁচে পাওয়া গেলো বড় বড় ইলিশ!

ভোলায় চরফ্যাশন উপজেলার একটি পুকুর সেঁচে মিলেছে বড় সাইজের ৮টি ইলিশ মাছ। প্রতিটি ইলিশের ওজন …

Leave a Reply

Your email address will not be published.