মুক্তমঞ্চ বিতর্ক বাদ দিন, বাস্তবতা আমলে নিন ডেঙ্গু পরিস্থিতি

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন ক্রমেই বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রাণহানিও। একটি বিষয় খুবই গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষণীয়, সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে সতর্ক ও করণীয় সম্পর্কে সজাগ করে দিচ্ছে। সংবাদমাধ্যম এর বেশি কিছু করতে পারবে না। প্রতিরোধ-প্রতিকারে যা কিছু করণীয়, তা করতে হবে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে। ডেঙ্গুজ্বরের কারণ সম্পর্কে অনেকেরই জানা। মশাবাহিত এ রোগের বিস্তার এবং মশার বংশক্ষেত্র বিস্তৃতকরণের প্রেক্ষাপটও সচেতন মানুষের জানা।ডেঙ্গুর ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর উদাসীনতা বলব না বরং দূরদর্শিতার ঘাটতির বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট। শুক্রবার সমকালের প্রথম পাতায় ঢাকা দক্ষিণের নগরপিতা সাঈদ খোকনের এ ব্যাপারে মন্তব্য পড়লাম- তা দুঃখজনক, অনাকাঙ্ক্ষিত, অবিবেচনাপ্রসূত। তিনি বলেছেন, মশা নিয়ে রাজনীতি কাম্য নয়। একই সঙ্গে বলেছেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ছেলেধরার মতো গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গু আক্রান্তদের তথ্য নিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমের ওপর যেভাবে দোষ চাপিয়ে দায় শেষ করতে চেয়েছেন, তা একজন নগরপিতার কাছে কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ কথা ভুলে যাওয়া আমাদের উচিত হবে না যে, গণমাধ্যম কিংবা সংবাদমাধ্যম অধিকতর ক্রিয়াশীল থাকায়ই অনেক ক্ষেত্রে আমরা এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করছি। যেমন ডেঙ্গুর ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টির মুখ্য কাজটি জোরদারভাবে এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমই করছে।

আমাদের জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের কোনো কোনো দায়িত্বশীলের অনেক ক্ষেত্রেই সত্য চাপিয়ে কিংবা এড়িয়ে চলার অপপ্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা নতুন কোনো বিষয় নয়। যেমন রাজধানীতে সরবরাহকৃত ওয়াসার পানি নিয়ে যখন হৈচৈ শুরু হলো, তখন বিষয়টি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ মানতেই চায়নি। এ নিয়ে নানা রকম অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াল, তখন দেশবাসী স্পষ্ট হলো, অভিযোগ মোটেও অসত্য নয় বরং পানীয়জলের নামে ঢাকার কোনো কোনো এলাকার মানুষ বিষপান করছেন। এটি একটিমাত্র খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। এ রকম দৃষ্টান্ত আরও বহুক্ষেত্রেই দেওয়া যাবে। কাজেই মশক নিধন কিংবা ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপে আরও কিছু অত্যাবশ্যকীয় করণীয় যে রয়ে গেছে বা মশক নিধন ওষুধের অকার্যকারিতা নিয়ে সংবাদমাধ্যম যে চিত্র উপস্থাপন করেছে, তা মোটেও অমূলক নয়। সমস্যাটা তখনই প্রকট হয়, যখন সত্য চাপিয়ে কিংবা অস্বীকার করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তা না করে যদি সত্য আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পথটা সুগম করা হয়, তাহলেই সুফলের আশা করা যায়। কাজেই সচেতন তো শুধু সাধারণ মানুষকেই হলে চলবে না, সচেতন-সতর্ক হতে হবে দায়িত্বশীলদেরও।

ডেঙ্গুর ব্যাপকতা ঢাকায় প্রকটভাবেই দেখা দিয়েছে এবং এ নিয়ে জনমনে সঙ্গতই আতঙ্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। এটাই হলো বাস্তবতা। তবে এ ক্ষেত্রে জরুরি হলো সচেতনতা। প্রতিদিন হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে, আক্রান্তদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য, মানুষ স্বজনও হারাচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের তথ্যচিত্র কিংবা পরিসংখ্যান সঠিক নয় কিংবা এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম বাড়াবাড়ি করছে- এসব তর্কে না গিয়ে দায়িত্বশীলরা করণীয় সম্পর্কে সজাগ ও দায়িত্বশীল হলেই মঙ্গল। যোগ, গুণ, ভাগ অঙ্কের এসব সূত্র বাদ দিয়ে; পরিসংখ্যানের কচকচানি বন্ধ করে মশক নিধন অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসাসেবার পথ আরও সুগম করাটাই হলো জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও চিকিৎসাসেবা সুলভ করার ব্যবস্থাটা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ তদারকি দরকার। অহেতুক বিতর্কে মানুষের কোনো কল্যাণ কোনোদিন হয়ওনি, হবেও না। তাই বাস্তবতা আমলে নিয়েই এগোতে ও সব রকম ব্যবস্থার পথ মসৃণ করতে হবে।

এবার ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার খবর ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। এমতাবস্থায় মশা নিয়ে মশকরা করার অবকাশ দায়িত্বশীলদের নেই। শুধু সাধারণ মানুষই নন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সরকারের দায়িত্বশীল লোকজনও রয়েছেন এবং হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন, রাজধানীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্সের মৃত্যুসহ আরও মর্মন্তুদ খবর পাওয়া গেছে। এক কথায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। সরকারি হাসপাতালে রোগীর তিলধারণের ঠাঁই নেই; যার মধ্যে ৮০ ভাগই ডেঙ্গু রোগী বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ। অর্থমন্ত্রীও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমেই জেনেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বর্তমানে লন্ডন সফরে থাকলেও প্রায় প্রতিদিন পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। আক্রান্তরা যাতে সুচিকিৎসা পান, এ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তার এ তৎপরতা সাধুবাদযোগ্য। এমতাবস্থায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগরপিতার মন্তব্য দুঃখজনক এবং তা মেনে নেওয়া যায় না।

ডেঙ্গুজ্বরের মাত্রাটা যখন কমে আসে, তখন এর আরও কিছু অদৃশ্য বিপজ্জনক দিক শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। র'ক্তে নানারকম জটিলতা দেখা দেয় এবং এসব নিরূপণও সহজসাধ্য নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের চেয়ে দক্ষিণে এর প্রকোপ বেশি- এ খবরও সংবাদমাধ্যম সূত্রেই জানা গেছে। অভিজাত এলাকায় মশক নিধন কর্মীরা নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারেন না- এ অভিযোগও নতুন নয়। আমাদের সব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা আছে। জনবল, অর্থবল কোনো কিছুই আমাদের উপচেপড়ার মতো নয়। তাছাড়া প্রায় আড়াই কোটি জনঅধ্যুষিত এই মহানগরে সরকার কিংবা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষে একেবারে সম্পূর্ণ নিখুঁত সবকিছু করাও সহজ নয়। এ জন্য জনসম্পৃক্ততা-সহযোগিতার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের যা করণীয়, এ ক্ষেত্রে যদি এর ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে বিপদাশঙ্কা বাড়বে- এটিই খুব স্বাভাবিক। মশক নিধন ওষুধের কার্যকারিতা নেই, তা তো আরও আগেই বোঝা গিয়েছিল। ওষুধ ছিটানো হচ্ছে; কিন্তু কাজ হচ্ছে না। তার মানে ওষুধের গুণগত মানের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।

জনকল্যাণে যখন একটি বিষয় স্থির হয়, তখন নিশ্চয় তা অধিকতর পর্যালোচনা কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই করা উচিত। মশক নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, এই ওষুধের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কি তাহলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি? যদি তাই হতো, তাহলে এখন তো এর অকার্যকারিতা পরিলক্ষিত হতো না। এখন নতুন ওষুধ এনে তা প্রয়োগ করতেও হয়তো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আরও কিছু সময়ক্ষেপণ হয়ে যাবে। আমাদের অভিজ্ঞতা তো অনেক ক্ষেত্রেই এমন তিক্ত। ততক্ষণে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? এই যে অকার্যকর ওষুধ ছিটিয়ে এত টাকা বিনাশ করা হলো, এরই-বা জবাব কী? একসময় মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা ছিল। সেই যুদ্ধে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। কিন্তু ডেঙ্গু প্রতিরোধে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সমভাবেই ব্যর্থতা। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক দায়ও কম নয়। পারিপারিকভাবেও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সরকারি সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ সালে প্রথম ঢাকায় বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এরপর প্রায় বছরই এ সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এবারের চিত্র এককথায় ভয়াবহ।

সংবাদমাধ্যম জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু অনেকেরই দূরত্ব আছে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। তাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান গতিশীল করাও বাঞ্ছনীয়। সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়গুলো সম্পর্কে আরও সচেতন করে তোলার কার্যক্রম সরকারের সংশ্নিষ্ট সব মহল থেকে জোরদারভাবে চালানো অত্যন্ত জরুরি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি বছরে ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস ডেঙ্গুর জন্য আরও স্পর্শকাতর সময়। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্নিষ্ট সবার কি তা মোকাবেলার প্রস্তুতি আছে? কিংবা এবার যদি আগাম প্রস্তুতিটা আরও জুতসই হতো, তাহলে কি এর প্রকোপ এত ব্যাপক হতে পারত? আমি নিজেও এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী। আমার কয়েকজন স্বজন আক্রান্ত হয়েছেন। আমার পারিবারিক বেদনাও আছে এ নিয়ে। আমি নিজে হাসপাতালগুলোতে খণ্ডিতভাবে ডেঙ্গুর যে চিত্র দেখেছি, তাতে সহজেই অনুমান করতে পারি, সংবাদ কিংবা গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে মোটেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে না।ডেঙ্গুর কারণ এডিস মশা এবং এই মশার জন্ম, বংশবিস্তার সম্পর্কে আমরা জানি। আমি শুধু এ ক্ষেত্রে একটু যোগ করতে চাই। মহানগরীর শৌখিনদের ছাদ বাগান, বারান্দায় বাগান করার ব্যাপারে সজাগ-সতর্ক থাকতে অনুরোধ করি। কারণ এডিস মশার বংশবিস্তারের এও একটি মাধ্যম। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি পরিবারের বড়দের সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তারা ডেঙ্গুর উপসর্গ বুঝবে না। ডেঙ্গু আক্রান্তকে অর্থাৎ জ্বর দেখা দিলেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এডিস মশার স্থান ধ্বংস করতে নাগরিকদের সহযোগিতা নিয়ে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্বশীলদের দায়বদ্ধতা-জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি। এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ নির্ণয় করতে হবে সংবলিত প্রচেষ্টায়।

Check Also

যে কারণে উধাও হলো বগুড়ার সেই পুকুরের মাছ-পানি

দীর্ঘ বছরের পুরোনা পুকুর। হঠাৎ কী এমন হলো যে নিমিষেই পানি ও মাছ শূন্য হয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *