Breaking News

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় সবারই সুবিধা উচ্চশিক্ষা

জুলাই মাসে বাংলাদেশের সব শিক্ষা বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের ফলের তুলনায় এ বছর যেমন বেড়েছে পাসের হার, তেমনই বেড়েছে ‘জিপিএ ফাইভ’ পাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আনন্দের। এই আনন্দের মাঝেও যুক্ত হয়েছে একটি নতুন চিন্তা- সংশ্নিষ্ট ছাত্রছাত্রীরা তাদের আশানুরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বিষয়টিতে ভর্তি হতে পারবে কি-না।অনেক অভিভাবকই ভাবেন, তাদের সন্তানটি যেন অন্তত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনো বিষয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেন। কারণ, একজন পরীক্ষার্থী নির্দিষ্ট কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই পরীক্ষার্থীকে প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে সারাদেশ ঘুরে বেড়াতে হয়। এতে অর্থের সঙ্গে সময়ও ব্যয় হয় অনেক। দেখা যায়, এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকে একটি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু হতে হতে ছয় থেকে আট মাস সময় চলে যায়। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর ভার্সিটি জীবনের শুরুই হয় সেই ছয় থেকে আট মাসের সেশনজট মাথায় নিয়ে, যা পরবর্তী সময়ে কোনোভাবেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।

বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী ক্ষেত্রভেদে ১০ থেকে ২০টি এমনকি তারও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করে থাকে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবার রয়েছে বিভিন্ন ইউনিট। কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে ভর্তির সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক শিক্ষার্থীই একাধিক ইউনিটে ভর্তির জন্য আবেদন করে থাকে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ফি ও যাতায়াত বাবদ প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। এ বিষয়ে দৈনিক সমকালে সম্প্রতি একাধিক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। এই বিশাল ব্যয় আমাদের দেশের অধিকাংশ অভিভাবকের পক্ষেই বহন করা সম্ভব হয় না। ফলে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার আশা নিরাশায় পরিণত হয়।দেশে বর্তমানে ৪৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। হলফ করে বলা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের প্রথম পছন্দ। পছন্দ হলে কী হবে, এগুলোতে ভর্তি হতে গিয়ে যে হিমশিম খেতে হয়, তা রীতিমতো একটি যুদ্ধ। দেখা যায়, আজ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে রাতের বাসেই বা ট্রেনে চেপে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পরদিন অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যেতে হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকরা। অনেক সময় এমনও ঘটে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে বা আবাসিক হোটেলে স্থান না পেয়ে আশাকাতর মা-বাবা তাদের মেয়েটিকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেন। এমন একটি ঘটনা তিন বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছিল, যা তখন একটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে, একজন মা তার ভর্তিচ্ছু মেয়েটিকে নিয়ে হোটেল বা অন্য কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে মাদুর বিছিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশনে খোলা আকাশের নিচে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছিলেন। ভাবতেই কষ্ট লাগে, কী ভয়ঙ্কর একটি দৃশ্য!

আনন্দের বিষয়, এরই মধ্যে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত জুনে অনুষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার ১১৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সর্বসম্মতভাবে সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। আমরা আশাবাদী ছিলাম, অপরাপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী এবং সম্মানিত অভিভাবকদের কষ্ট লাঘবের কথা চিন্তা করে অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণে একমত পোষণ করবে। জানা গেছে, বিভিন্ন কারণে তা এবার সম্ভব হচ্ছে না।শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া উচিত শিক্ষার্থীবান্ধব। যেহেতু এ বছর সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গত বছর ইউনিট সংখ্যা কমিয়ে সমধর্মী বা সমবৈশিষ্ট্য বিভাগগুলোকে নিয়ে আটটি থেকে কমিয়ে মাত্র চারটি ইউনিটের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু এ বছর সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই এ বছরও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র চারটি ইউনিটের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি অনুরূপভাবে ইউনিট সংখ্যা কমিয়ে সমধর্মী বা সমবৈশিষ্ট্য বিভাগগুলোকে নিয়ে ইউনিট সংখ্যা কমিয়ে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলেও শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের কষ্ট অনেকাংশেই লাঘব হবে।

আমাদের দেশে বর্তমানে সাধারণ, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল; কৃষি ও মেডিকেল- এ চারটি ধারার উচ্চশিক্ষা প্রচলিত রয়েছে। মেডিকেল কলেজগুলোতে অনেক আগে থেকেই ‘সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা’ চালু আছে এবং এ বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা চালু করতে যাচ্ছে। তাহলে বাকি থাকে সাধারণ, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেকেই বলে থাকেন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পঠন-পাঠন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। যদি তাই হয়, তাহলে সব প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় একটি এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আলাদাভাবে একটি ভর্তি পরীক্ষা নেয়, তাহলে একজন পরীক্ষার্থী সর্বমোট চারটি ভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা দিলেও তাদের কষ্ট অনেকাংশেই কমে যাবে, সাশ্রয় হবে অভিভাবকের অর্থ এবং সেই সঙ্গে বহুলাংশে কমে যাবে সেশনজট।স্বীকার করতেই হয়, সমন্বিত বা গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় কিছু সমস্যাও হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সদাশয় হলে তা কাটিয়ে ওঠা মোটেই অসম্ভব বলে মনে হয় না। সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষায় লাভবান হবেন আমাদেরই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এই পদ্ধতিতে একজন পরীক্ষার্থী তার বাড়ির কাছেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে সেদিনই হয়তো বাড়ি ফিরতে পারবে।

দেশে প্রতিবছর বারো-তেরো লাখ শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। তাদের মধ্যে যারা অধিকতর মেধাবী তারা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা যখন ভর্তি হয়ে যায়, তখন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আসনটি খালি হয়ে পড়ে। এই আসনগুলো অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পূরণ করা হলেও সেশন শুরুর দু-তিন মাসের মাথায় দেখা যায়, অনেক ছাত্রই ক্লাসে অনুপস্থিত। কারণ, ভর্তিকৃত ছাত্রছাত্রীটি হয়তো অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ভর্তি হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে অনেক আসন খালিই থেকে যায়। সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিলে এ সমস্যাও অনেকটা সমাধান হবে, আসন খুব কমই খালি থাকবে। এ বছর বিভিন্ন কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে’ ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা প্রত্যাশা করি, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, যিনি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বানে সংশ্নিষ্ট সবাই সাড়া দেবেন।

Check Also

বিশ্বসেরার তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি লয়েডসের তালিকায় এগোলো ৬ ধাপ

প্রয়োজনের অর্ধেক যন্ত্রপাতিও নেই। অভাব রয়েছে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের। প্রকল্প পাসের ক্ষেত্রেও আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.