Breaking News

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য তারাপদ স্যার :আমাদের অভিভাবক জন্মদিন

এখনও প্রতিদিন বিকেলে ঝিলটুলীর বাসা থেকে নিয়মিত হেঁটে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে যান অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সাংবাদিক জগদীশচন্দ্র ঘোষ। তিনি ‘তারাপদ স্যার’ বলে সমধিক পরিচিত। পরনে সেই চিরাচরিত পোশাক পাজামা-পাঞ্জাবি। মাঝেমধ্যে ধুতি-পাঞ্জাবিও পরতে দেখেছি।শিক্ষক ও সাংবাদিক দুই পরিচয়েই তিনি খ্যাতিমান। দীর্ঘদিন দৈনিক অবজারভারের ফরিদপুর প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৪৯ থেকে শিক্ষকতা শুরু। ‘৫৯ থেকে ‘৯৫ সাল- ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে যুগপৎ অঙ্ক ও ইংরেজি পড়িয়েছেন। স্কুলটির রয়েছে গৌরবময় অতীত। ১৮৫১ সালে স্বদেশি চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হয় মিডিল ভার্নাকুলার স্কুল (স্বদেশি স্কুল), যা পরবর্তী সময়ে ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় বলে পরিচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ছিল স্বদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক। ফরিদপুরের তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ভগবানচন্দ্র বসু তার ছেলেকে জিলা স্কুলে না দিয়ে এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। সেই ছেলেই জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। সে এক বিস্মৃত অধ্যায়। আমার মনে হয়, তারাপদ স্যার হৃদয়ের মাঝে প্রতিষ্ঠানটির আদর্শ-পতাকা উঁচিয়ে রেখেছিলেন।

অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অঙ্ক ও ইংরেজিতে ভালো ফল পেতে তারাপদ স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ত। তিনি সকাল-বিকেলে বাসাতেই পড়াতেন। কে টাকা দিল বা না দিল, তা নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল না। আমার বন্ধুদের অনেকে তাঁর কাছে পড়েছে। আমি তাঁর সরাসরি ছাত্র না হলেও শিক্ষক মান্য করি। কখনও স্যার, কখনও দাদা বলি। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার, অভিভাবক, অগ্রজ ও বন্ধু।তারাপদ স্যার শৈশবে স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে থাকেননি। তবে রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন না। তিনি রাজনীতি-সচেতন :অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল চেতনার মানুষ। পাকিস্তান আমলে ন্যাপ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ছিল যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব। ছোট ভাই চিত্ত ঘোষ ন্যাপ করতেন। তাঁর বাড়িতে ছিল কমিউনিষ্ট কর্মীদেরও আসা-যাওয়া। স্বাধীনতার জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা কেড়ে নিয়েছে তাঁর বাবা, ভাই ও কাকাতো ভাইয়ের জীবন।

স্বাধীনতার পর বিরাট দায়িত্ব তাঁর কাঁধে পড়ল। ভাই, বোন ও শহীদ ভাইয়ের সন্তানদের নিয়ে বড় এক যৌথ পরিবারের ভার অকৃতদার তারাপদ স্যারকে বইতে হয়েছে। কিন্তু কখনও বিস্মৃত হননি স্বদেশ ভাবনা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির ঐক্যে জোর দিতেন। বলতেন, সামরিক স্বৈরাচার হটাতে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপ, সিপিবিসহ সব প্রগতিশীল দলকে বিরোধ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তখন আমি জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। কেন্দ্রীয় কমিটির সভার খবর পত্রিকায় দেখে আমাকে ডেকে পাঠাতেন। বোঝাতেন, আমি যাতে সভায় বৃহত্তর ঐক্যের পক্ষে কথা বলি। ১৯৮৩ সালে ১৫ দল গঠনের পর খুব খুশি হয়েছিলেন। স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে চিত্তদা, কমিউনিস্ট পার্টির আতিয়ার রহমান (প্রয়াত) ও আমি তারাপদ স্যারের সঙ্গে বসেছি, পরামর্শ করেছি। ‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর’ ও ‘ফিরে দেখা একাত্তর’ লেখার সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছি, অনেক অজানা তথ্য পেয়েছি। এখনও ফরিদপুর গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। কখনও সাক্ষাৎ দীর্ঘ আড্ডায় পরিণত হয়। যেখানে প্রায়শই থাকেন চিত্তদা ও হাসানুজ্জামান, সমকালের স্টাফ রিপোর্টার। চা-নাশতা হাতে যোগ দেন চিত্তদা-পত্নী শিপ্রাদি, শহীদ সন্তান অধ্যাপক শিপ্রা রায়।১৯৮৮ সালের ৬ ডিসেম্বর তারাপদ স্যারের জীবনে আরও একটি কষ্টকর দিন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বঙ্গভূমি আন্দোলনের অভিযোগ এনে ফরিদপুর, যশোর ও খুলনার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু লোককে জেলে পোরা হয়। ফরিদপুর থেকে গ্রেফতার হন তারাপদ স্যার, চিত্ত ঘোষ, ডা. ননীগোপাল সাহা, রাধা গোবিন্দ সাহা প্রমুখ। পাঁচ মাস জেলে ছিলেন। মুক্তির পর দেখা করতে গেলে তারাপদ স্যার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, যে দেশের জন্য আমার বাবা ও ভাই র'ক্ত দিয়েছেন, আমি সেই দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করব! সেদিন বাকরুদ্ধ আমি দেশপ্রেমিক মানুষটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাইনি।

নম্র ও বিনয়ী লোকটি যে কতখানি দৃঢ়চিত্তের তার প্রমাণ পেয়েছি গৌতম হ'ত্যার প্রতিবাদ-আন্দোলনে। ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর বিএনপি সরকারের আশ্রিত ঠিকদার নামধারী দুর্বৃত্তরা সমকালের ফরিদপুর ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাসকে নির্মমভাবে হ'ত্যা করে। এর বিরুদ্ধে তারাপদ স্যারকে আহ্বায়ক করে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। তখন অনেকের সংশয় ছিল এই ভেবে যে, নরম প্রকৃতির তারাপদ স্যার কতদূর যেতে পারবেন? এমন সংশয় মিথ্যা প্রমাণ করলেন তিনি। তার নেতৃত্বে ফরিদপুরে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, প্রশাসন অপরাধীদের গ্রেফতারে বাধ্য হয়েছিল। উল্লেখ্য, দ্রুত বিচার আদালতে গৌতম হ'ত্যায় অভিযুক্ত ৯ ব্যক্তির যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে।তারাপদ স্যারের সাংবাদিক পরিচিতিও ম্রিয়মাণ নয়। কয়েকবার ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। ফরিদপুর সাংবাদিক সমিতির ‘শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান স্বর্ণপদক’, সমকালের ‘শহীদ গৌতম পদক’, ‘ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব স্মারক সম্মাননা’ পেয়েছেন। তিনি ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের মধ্যমণি এবং সন্তানতুল্য সংবাদকর্মীদের পথপ্রদর্শক।কীর্তি শিক্ষক-সাংবাদিক তারাপদ স্যারের ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা। আশা করি, শত বছর বেঁচে থাকবেন, প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে আমাদের পথ দেখাবেন।

Check Also

যারা বাচ্চাকে সাড়ে ৩-৪ বছরে স্কুলে দিবেন ভাবছেন, তাদের জন্য খুবই জরুরী এই পোস্ট

আমাদের দেশের স্কুল মানেই একেবারে সিরিয়াস লেখাপড়া। আর আপনারা এখন খেলার ছলে শিখাচ্ছেন তাই শিখছে।স্কুল …

Leave a Reply

Your email address will not be published.